ইন্দ্রিয়তন্ত্র/ভারসাম্যতন্ত্র
ভূমিকা
ভারসাম্যতন্ত্র বা ভেস্টিবুলার সিস্টেমের প্রধান কাজ হলো মাথার নড়াচড়া (বিশেষত অনৈচ্ছিক নড়াচড়া), শনাক্ত করা ও এর ফলে প্রতিক্রিয়ায় প্রতিফলিত চোখের নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গির সমন্বয় সাধন করে দৃষ্টিশক্তিকে স্থিতিশীল রাখা এবং পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা।
ভেস্টিবুলার ব্যবস্থার উপর একটি চমৎকার ও বিস্তারিত প্রবন্ধ পাওয়া যাবে স্কলারপিডিয়ায় [১]।
আমাদের বর্তমান ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা সংক্রান্ত জ্ঞানের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা উপস্থাপিত হয়েছে জে গোল্ডবার্গ লিখিত "ভেস্টিবুলার সিস্টেম: আ সিক্সথ সেন্স" গ্রন্থে।[২]
ইন্দ্রিয়তন্ত্র/ভারসাম্যতন্ত্রের অঙ্গসংস্থান
সংকেত প্রক্রিয়াকরণ
পার্শ্বীয় সংকেত রূপান্তরণ
সরল ত্বরণ এর রূপান্তরণ
ওটোলিথ অঙ্গগুলোর হেয়ার সেলগুলি এমন এক প্রক্রিয়ায় জড়িত, যেখানে তারা সরল ত্বরণ দ্বারা সৃষ্ট যান্ত্রিক বলকে একটি বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। যেহেতু এই বলটি মাধ্যাকর্ষণ এবং মাথার সরল গতি — এই দুইয়ের যৌথ ফলাফল,
তাই একে কখনো কখনো গ্রাভিটো-ইনর্শিয়াল বল বলা হয়। রূপান্তরণের প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এভাবে কাজ করে: ওটোকোনিয়া নামক ক্যালসিয়াম কার্বোনেট স্ফটিক, যা ওটোলিথ ঝিল্লির উপরের স্তরে থাকে, আশপাশের উপাদানগুলোর তুলনায় বেশি ঘনত্বসম্পন্ন। তাই একক ত্বরণ ওটোকোনিয়ার স্তরকে সংযোগকারী টিস্যুর তুলনায় স্থানচ্যুত করে। এই স্থানচ্যুতি হেয়ার সেলগুলি অনুভব করে। চুলগুলো বেঁকে গেলে কোষটি মেরুবিশিষ্ট হয় এবং একটি আবেগ উদ্দীপনা বা দমন তৈরি হয়।

যেখানে প্রতিটি সেমিসারকুলার ক্যানাল শুধুমাত্র ঘূর্ণন ত্বরণের এক-মাত্রিক উপাদান বুঝতে পারে, সেখানে সরল ত্বরণ ইউট্রিকল ও স্যাকুল উভয়ের ম্যাকুলায় জটিল দমন ও উদ্দীপনার প্যাটার্ন তৈরি করে। স্যাকুল ল্যাবিরিন্থের ভেস্টিবিউলের গোলাকার রিসেসের মধ্যবর্তী প্রাচীরে অবস্থিত এবং এর ম্যাকুলা উল্লম্বভাবে অভিমুখী। ইউট্রিকল স্যাকুলের উপরে অবস্থিত এবং এর ম্যাকুলা মাথা সোজা অবস্থায় আনুমানিক অনুভূমিকভাবে অবস্থিত। প্রতিটি ম্যাকুলার মধ্যে হেয়ার সেলগুলোর কিনোসিলিয়া সব দিকেই মুখ করে থাকে।
তাই মাথা সোজা অবস্থায় সরল ত্বরণের অধীনে, স্যাকুলার ম্যাকুলা উল্লম্ব সমতলে ত্বরণ অনুভব করে, আর ইউট্রিকুলার ম্যাকুলা অনুভূমিক সমতলে সব দিকের ত্বরণ এনকোড করে। ওটোলিথিক ঝিল্লি এতটাই নরম যে প্রতিটি হেয়ার সেল স্থানীয় বলের দিকের আনুপাতিকভাবে বাঁকে যায়। যদি নির্দেশ করে হেয়ার সেলের সর্বাধিক সংবেদনশীলতার দিক বা অন-দিক এবং নির্দেশ করে গ্রাভিটো-ইনর্শিয়াল বল, তাহলে স্থির ত্বরণ দ্বারা উদ্দীপনার মান হয়
ওটোলিথ ম্যাকুলাগুলিতে উদ্দীপনার প্যাটার্ন থেকে ত্বরণের দিক এবং মাত্রা নির্ধারিত হয়।
কৌণিক ত্বরণের রূপান্তরণ
তিনটি সেমিসারকুলার ক্যানাল কৌণিক ত্বরণের সংবেদনের জন্য দায়ী। যখন মাথা কোনও সেমিসারকুলার ক্যানালের সমতলে ত্বরণ করে, তখন ইনারশিয়ার কারণে সেই ক্যানালের এন্ডোলিম্ফ চলন্ত ক্যানালের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। ফলে এন্ডোলিম্ফ মাথার গতির বিপরীত দিকে আপেক্ষিকভাবে চলমান হয় এবং কাপুলাকে চাপ দেয় ও বিকৃত করে। কাপুলার নিচে ক্রিস্টার উপর হেয়ার সেলগুলি সারিবদ্ধ থাকে এবং তাদের স্টেরিওসিলিয়া কাপুলার মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে তারা ত্বরণের দিক অনুযায়ী উদ্দীপ্ত বা দমিত হয়।

এই প্রক্রিয়াটি ক্যানাল সংকেতের ব্যাখ্যাকে সহজ করে: যদি একটি সেমিসারকুলার ক্যানালের দিকনির্দেশনা ইউনিট ভেক্টর দ্বারা বর্ণিত হয়, তবে ঐ ক্যানালের উদ্দীপনা হবে কৌণিক বেগ এর সেই ক্যানালের উপর প্রকল্পন:
হরিজন্টাল সেমিসারকুলার ক্যানাল উল্লম্ব অক্ষ ঘিরে ত্বরণ (যেমন গলায়) অনুভব করে। অ্যান্টেরিয়র ও পোস্টেরিয়র ক্যানাল যথাক্রমে মাথার স্যাজিটাল সমতলে (যেমন মাথা নাড়ানো) এবং ফ্রন্টাল সমতলে (যেমন কার্টহুইলিং) ঘূর্ণন সনাক্ত করে।
প্রতিটি কাপুলার মধ্যে হেয়ার সেলগুলি একই দিকে মুখ করে থাকে। উভয় পাশের সেমিসারকুলার ক্যানাল একত্রে একটি পুশ-পুল সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ডান ও বাম হরিজন্টাল ক্যানালের ক্রিস্টাগুলি একে অপরের “আয়নার প্রতিচ্ছবি” হওয়ায় তারা সর্বদা বিপরীত প্রতিক্রিয়া (পুশ পাল মুলনীতি) দেখায়। মাথা বাঁ দিকে দ্রুত ঘুরলে, ডান হরিজন্টাল ক্যানালের হেয়ার সেলগুলো ডিপোলারাইজ হয় এবং স্নায়ু সংকেতের হার বাড়ে, অপরদিকে বাম দিকের হেয়ার সেলগুলো হাইপারপোলারাইজ হয়ে সংকেত হার কমায়। এই প্রতিফলন ডান অ্যান্টেরিয়র ও বাম পোস্টেরিয়র ক্যানাল, এবং বাম অ্যান্টেরিয়র ও ডান পোস্টেরিয়র ক্যানাল-কেও প্রযোজ্য।
কেন্দ্রীয় ভেস্টিবুলার পথসমূহ
ভেস্টিবুলার সিস্টেম থেকে আগত তথ্য শ্রবণতন্ত্রের তথ্যসহ মস্তিষ্কে পৌঁছে ভেস্টিবুলো-কক্লিয়ার স্নায়ু বা অষ্টম করোটিক স্নায়ুর মাধ্যমে। ম্যাকুলা ও ক্রিস্টার হেয়ার সেলগুলোকে সংবেদনশীল করে এমন বাইপোলার অ্যাফারেন্ট নিউরনের কোষদেহ ভেস্টিবুলার গ্যাংলিয়ন-এ (বা স্কার্পার গ্যাংলিয়ন) থাকে, যা ইন্টারনাল অডিটরি মিয়েটাসের কাছে অবস্থিত। এই গ্যাংলিয়ন থেকে বের হওয়া অ্যাকসনগুলো শ্রবণ নিউরনের অ্যাকসনগুলোর সাথে একত্র হয়ে অষ্টম স্নায়ু গঠন করে, যা ফেশিয়াল নার্ভের সাথে ইন্টারনাল অডিটরি মিয়েটাস দিয়ে যায়। প্রাথমিক ভেস্টিবুলার অ্যাফারেন্ট নিউরনগুলো ব্রেইনস্টেমে অবস্থিত ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়ার কমপ্লেক্স নামক চারটি নিউক্লিয়াসে প্রক্ষেপণ করে।
ভেস্টিবুলো-ওকুলার রিফ্লেক্স
ভারসাম্যতন্ত্রের একটি বহুল গবেষিত উদাহরণ হলো ভেস্টিবুলো-ওকুলার রিফ্লেক্স (VOR)। এর কাজ হলো মাথা ঘোরার সময় চিত্রকে স্থির রাখা। অর্থাৎ, অনুভূমিক, উল্লম্ব বা টরশনাল ঘূর্ণনের সময় চোখ এমনভাবে ঘোরে যেন চিত্র রেটিনায় স্থির থাকে। মাথা ডানে ঘুরলে, চোখ সমান গতিতে বামে ঘোরে। তাই চোখের স্থিতিশীলতার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
VOR কীভাবে কাজ করে? ভেস্টিবুলার সিস্টেম মাথা কত দ্রুত ঘোরে তা নির্দেশ করে এবং ওকুলোমোটর সিস্টেম সেই তথ্য ব্যবহার করে চোখ স্থির রাখে। ভেস্টিবুলার নার্ভ ভেস্টিবুলার গ্যাংলিয়ন থেকে সংকেত নিয়ে নিউক্লিয়ার কমপ্লেক্সে পাঠায়, যেখানে স্পাইনাল কর্ড, সেরিবেলাম এবং ভিজ্যুয়াল সিস্টেমের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ হয়। এখান থেকে সংকেত বিপরীত দিকের অ্যাবডুসেন্স নিউক্লিয়াসে যায়। একটি স্নায়ু সরাসরি অ্যাবডুসেন্স নার্ভ হয়ে ল্যাটারাল রেকটাস মাংসপেশিতে যায়, অন্যটি ইন্টারনিউরনের মাধ্যমে ওকুলোমোটর নিউক্লিয়াসে যায়, যা মিডিয়াল রেকটাস সক্রিয় করে। এই সংক্ষিপ্ত সংযোগকে তিন-নিউরন-আর্ক বলা হয়, যা ১০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে চোখের গতি ঘটায়।
উদাহরণস্বরূপ, মাথা ডানে ঘোরালে ডান হরিজন্টাল ক্যানালের হেয়ার সেলগুলো ডিপোলারাইজ হয়, আর বামের গুলো হাইপারপোলারাইজ হয়। ফলে ডান ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়াসে সংকেত বাড়ে। এই সংকেত বাম অ্যাবডুসেন্স নিউক্লিয়াস ও ডান ওকুলোমোটর নিউক্লিয়াস সক্রিয় করে, যার ফলে বাম ল্যাটারাল ও ডান মিডিয়াল রেকটাস সংকুচিত হয়। অন্যদিকে ডান ল্যাটারাল ও বাম মিডিয়াল রিল্যাক্স হয়। ফলে চোখ বামে ঘোরে।
VOR-এর গেইন সংজ্ঞায়িত হয় মাথার ঘূর্ণনের তুলনায় চোখ কতটা ঘোরে তা দিয়ে:
যদি গেইন ১ না হয়, তাহলে চিত্র রেটিনায় দুলে ওঠে এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়। তখন সেরিবেলাম মোটর লার্নিং-এর মাধ্যমে VOR-এর গেইন ঠিক করে।
সেরিবেলাম ও ভারসাম্যতন্ত্র
দেহভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট আচরণ অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়া যায়। রোগীর উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে মোটর লার্নিং-এ সেরিবেলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বিশেষত, VOR-এর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেরিবেলামের ভূমিকা বিস্তৃতভাবে গবেষিত হয়েছে। দেখা গেছে যে, VOR পথের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বা ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাগনিফাইং লেন্স ব্যবহার করে পরিবর্তন করা হলেও, VOR-এর গেইন একে পৌঁছায়।
এই অভিযোজন কীভাবে হয়, তা নিয়ে দুটি মত আছে: একটিতে (আইটো,১৯৭২; ১৯৮১) বলা হয়েছে সেরিবেলাম নিজেই শিক্ষার স্থান। অপরটিতে (মাইল্স আর লিসবার্গার,১৯৮২) বলা হয়েছে যে ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়াস শেখে, আর সেরিবেলাম তাতে নির্দেশনা দেয়। ভেস্টিবুলার নিউরনগুলো সরাসরি ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়াসে উত্তেজক সংকেত পাঠায় এবং একই সঙ্গে ফ্লকুলো-নডুলার লোব হয়ে পারালেল ও মসি ফাইবারের মাধ্যমে পারকিঞ্জি সেলকেও ইনপুট দেয়। পারকিঞ্জি সেলগুলি আবার ভেস্টিবুলার নিউক্লিয়াসে দমনমূলক সংকেত পাঠায়। Ito বলেন, এই উত্তেজক ও দমনকারী পথে ভারসাম্য পরিবর্তন করেই VOR গেইন মানিয়ে নেওয়া যায়। তার মতে, রেটিনাল ইমেজ স্লিপ একটি ভুল সংকেত হিসাবে ইনফেরিয়র অলিভারি নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে ক্লাইম্বিং ফাইবারে সেরিবেলামে যায়, যা পারকিঞ্জি সেলের দমন মডুলেট করে। অপরদিকে, মাইল্স ও লিসবার্গার লেন, শেখার স্থান নিউক্লিয়াসেই, আর সেরিবেলাম ভুল সংকেত তৈরি করে।
অ্যালকোহলের প্রভাবে ভারসাম্যতন্ত্র
আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানা থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে, অ্যালকোহল গ্রহণে ঘূর্ণনের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। এর ব্যাখ্যা বেশ সহজ এবং মূলত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: i) অ্যালকোহল এন্ডোলিম্ফের চেয়ে হালকা; এবং ii) রক্তে প্রবেশের পর অ্যালকোহল তুলনামূলকভাবে দ্রুত কাপুলায় পৌঁছে যায়, কারণ কাপুলার রক্ত সরবরাহ ভালো। এর বিপরীতে, এটি এন্ডোলিম্ফে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। একত্রে, এই কারণে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের পর কাপুলা ভাসমান হয়ে যায়। আপনি যখন পাশ ফিরিয়ে শুয়ে থাকেন, তখন বাম এবং ডান দিকের অনুভূমিক কাপুলার বিচ্যুতি একত্রিত হয়ে ঘূর্ণনের তীব্র অনুভূতি সৃষ্টি করে। প্রমাণ চাই? শুধু অপর পাশে গড়িয়ে যান – অনুভূত ঘূর্ণনের দিক উল্টো হয়ে যাবে!
কাপুলাগুলোর অবস্থানের কারণে, আপনি পাশ ফিরে শুলে সবচেয়ে প্রবল প্রভাব অনুভব করবেন। আপনি যখন চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন, তখন বাম ও ডান কাপুলার বিচ্যুতি পরস্পরকে বাতিল করে দেয়, ফলে অনুভূমিক ঘূর্ণন অনুভব হয় না। এটাই ব্যাখ্যা করে কেন বিছানায় একটি পা ঝুলিয়ে রাখা ঘূর্ণনের অনুভূতি কমিয়ে দেয়।
এই প্রভাবটি সর্বনিম্ন হয় মাথা সোজা অবস্থায় – তাই পার্টির সময় যতক্ষণ সম্ভব সোজা হয়ে থাকার চেষ্টা করুন!
যদি আপনি অত্যধিক অ্যালকোহল পান করেন, তাহলে পরদিন সকালে এন্ডোলিম্ফে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যালকোহল থাকবে – কাপুলার তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণেই তখন অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল (যেমন: একটি ছোট বিয়ার) পার্থক্যটি ভারসাম্য করে এবং ঘূর্ণনের অনুভূতি কমিয়ে দেয়।