পরমাণু চিকিৎসায় মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান/তেজস্ক্রিয় ক্ষয়

testwiki থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

গত অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে, তেজস্ক্রিয়তা হলো একটি প্রক্রিয়া। অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসগুলো আরও স্থিতিশীল অবস্থা অর্জনের জন্য এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। বলা হয় যে, স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টায় এই ধরনের নিউক্লিয়াসগুলোর ক্ষয় হয়। সুতরাং, এই অধ্যায়ের একটি বিকল্প শিরোনাম হলো নিউক্লীয় ক্ষয় প্রক্রিয়া।

আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আরও দেখেছি যে, কি ঘটছে তা বর্ণনা করার একটি উপায় হিসেবে আমরা নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা রেখা ব্যবহার করতে পারি। সুতরাং এই অধ্যায়ের একটি দ্বিতীয় বিকল্প শিরোনাম হলো নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা রেখায় পৌঁছানোর পদ্ধতিসমূহ।

আমরা এখানে প্রতিটি প্রধান ক্ষয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে যা জানা আছে তা বেশ সহজভাবে বর্ণনা ক'রে বিষয়টির প্রতি একটি বর্ণনামূলক বা পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করতে যাচ্ছি। আবারও বলছি, আপনারা হয়তো উচ্চ বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে এই বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই পড়েছেন। কিন্তু আমাদের সাথে থাকুন, কারণ এখানকার আলোচনা পরবর্তী অধ্যায়গুলোর জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করতে সাহায্য করবে।

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের পদ্ধতিসমূহ

স্বতন্ত্র নিউক্লিয়াসের কি ঘটে তা বিবেচনা করার পরিবর্তে, এমন একটি কাল্পনিক নিউক্লিয়াসের কথা ভাবা হয়তো সহজতর হবে, যেটি তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের প্রধান প্রধান রূপগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এই কাল্পনিক নিউক্লিয়াসটি নিচে দেখানো হলো।:

একটি কাল্পনিক নিউক্লিয়াস যা বিভিন্ন ধরণের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।

প্রথমত, আমরা আলফা-ক্ষয় নামক একটি প্রক্রিয়ায় দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রনকে একসাথে নির্গত হতে দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখতে পাই যে বিটা-প্লাস ক্ষয় নামক একটি প্রক্রিয়ায় একটি প্রোটন একটি পজিট্রন কণা নির্গত করতে পারে এবং বিটা-মাইনাস ক্ষয় নামক একটি প্রক্রিয়ায় একটি নিউট্রন একটি ইলেকট্রন নির্গত করতে পারে। আমরা একটি প্রোটন দ্বারা একটি ইলেকট্রনকে শোষিত হতেও দেখতে পাই। তৃতীয়ত, আমরা গামা-ক্ষয় নামক একটি প্রক্রিয়ার ফলে কিছু শক্তি (একটি ফোটন) নির্গত হতে দেখতে পাই, সেইসাথে দেখতে পাই একটি ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের দিকে আকৃষ্ট হয়ে আবার নির্গত হয়ে যাচ্ছে। সবশেষে রয়েছে বেশ বিধ্বংসী একটি প্রক্রিয়া যেখানে নিউক্লিয়াসটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যাকে স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন বলা হয়।

আমরা এখন এই প্রতিটি ক্ষয় প্রক্রিয়া একে একে বর্ণনা করব।

স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন

এটি একটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া যেটি কিছু ভারী নিউক্লিয়াসে ঘটে, যেখানে নিউক্লিয়াসটি ২টি বা ৩টি খণ্ডাংশ এবং কিছু নিউট্রনে বিভক্ত হয়। এই খণ্ডাংশগুলো নতুন নিউক্লিয়াস গঠন করে যেগুলি সাধারণত তেজস্ক্রিয় হয়। পারমাণবিক চুল্লিগুলো রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনের জন্য এই ঘটনাটিকে কাজে লাগায়। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এই প্রক্রিয়াটি এখানে আমাদের জন্য খুব বেশি আগ্রহের বিষয় নয় এবং আপাতত আমরা এ সম্পর্কে আর কিছু বলব না।

আলফা-ক্ষয়

এই ক্ষয় প্রক্রিয়ায় দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন একত্রে নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে যায় এবং এই সমাবেশটি আলফা কণা নামে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, একটি আলফা কণা আসলে একটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস।

তাহলে একে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বলা হয় না কেন? একে অন্য নাম দেওয়া হয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের ইতিহাসে নিহিত আছে। যখন এই বিকিরণগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখন আমরা জানতাম না যে এগুলো আসলে কি। আমরা জানতে পারলাম যে এই বিকিরণগুলোতে এক প্রকারের দ্বিগুণ ধনাত্মক চার্জ রয়েছে এবং এর বেশ কিছুদিন পর আমরা জানতে পারলাম যে এগুলো আসলে হিলিয়াম-৪ এর নিউক্লিয়াস। আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের বিকিরণকে আলফা রশ্মি নাম দেওয়া হয়েছিল (এবং অন্য দুটিকে বিটা ও গামা রশ্মি বলা হতো), এই শব্দগুলো গ্রিক বর্ণমালার প্রথম তিনটি অক্ষর। ঐতিহাসিক কারণে আমরা এখনও এই ধরনের বিকিরণকে আলফা কণা নামেই ডাকি। এই নামে ডাকার ফলে এই ক্ষেত্রের একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা তৈরি হয় এবং যা বাইরের লোকদের ভাবিয়ে তোলে যে বিষয়টি বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন!

কিন্তু লক্ষ্য করুন যে এই বিকিরণটি আসলে একটি অস্থিতিশীল বৃহত্তর নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত একটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস দ্বারা গঠিত। হিলিয়ামের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই, কারণ এটি আমাদের গ্রহে বেশ সহজলভ্য একটি মৌল। তাহলে এই বিকিরণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক কেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে যে শক্তির সাথে তারা নির্গত হয় তার মধ্যে এবং তারা যে বেশ ভারী আর তাদের একটি দ্বিগুণ ধনাত্মক আধান (পজিটিভ চার্জ) রয়েছে এই তথ্যের মধ্যে। তাই যখন এগুলো জীবন্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তখন নিজেদের গতি কমিয়ে আনার জন্য এবং দুটি ইলেকট্রন আকর্ষণ ক'রে একটি নিরপেক্ষ হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হওয়ার চেষ্টায় তারা সামনে পাওয়া অণুগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে।

এই ধরনের ক্ষয়ের একটি উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায় ইউরেনিয়াম ২৩৮ নিউক্লিয়াসে। যা ঘটে সেটি যে সমীকরণ দ্বারা প্রকাশ করা হয় তা হলো:

𝟗𝟐𝟐𝟑𝟖𝐔 → 𝟗𝟎𝟐𝟑𝟒𝐓𝐡 + 𝟐𝟒𝐇𝐞

এখানে ইউরেনিয়াম-২৩৮ নিউক্লিয়াস থেকে একটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস (আলফা কণা) নির্গত হয় এবং মূল নিউক্লিয়াসটি থোরিয়াম-২৩৪-এ পরিণত হয়। লক্ষ্য করুন যে, মূল নিউক্লিয়াসটির ভর সংখ্যা ৪ এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ হ্রাস পেয়েছে, যা আলফা ক্ষয়ের একটি বৈশিষ্ট্য এবং এটি যে কোনো নিউক্লিয়াসের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।

বিটা ক্ষয়

বিটা ক্ষয়ের তিনটি সাধারণ রূপ রয়েছে:

(ক) ইলেকট্রন নিঃসরণ

কিছু নিউক্লিয়াস, যেগুলিতে অতিরিক্ত নিউট্রন থাকে, সেগুলি একটি ইলেকট্রন নির্গমনের মাধ্যমে নিউট্রনকে প্রোটনে রূপান্তরিত ক'রে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। এই ইলেকট্রনকে বিটা-মাইনাস কণা বলা হয়, – মাইনাস কথাটি নির্দেশ করে যে কণাটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত।
যা ঘটে তা আমরা নিম্নরূপে উপস্থাপন করতে পারি:
n0 → p+ + e-
যেখানে একটি নিউট্রন রূপান্তরিত হয় একটি প্রোটন এবং একটি ইলেকট্রনে। লক্ষ্য করুন যে এই সমীকরণের উভয় দিকে মোট বৈদ্যুতিক আধান একই। আমরা বলি যে বৈদ্যুতিক আধান সংরক্ষিত থাকে।
আমরা ধরে নিতে পারি যে, যেহেতু ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকতে পারে না তাই এটি নির্গত হয়।
আবারও বলছি, ইলেকট্রনের মধ্যে অদ্ভুত বা রহস্যময় কিছুই নেই। তবে বিকিরণ সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি যে শক্তিতে নির্গত হয় সেটি এবং জীবন্ত পদার্থের সংস্পর্শে এসে যে এটি যে ধরণের রাসায়নিক ক্ষতি করতে পারে সেটি।
এই ধরণের ক্ষয়ের একটি উদাহরণ ঘটে আয়োডিন-১৩১ নিউক্লিয়াসে, যা একটি ইলেকট্রন নির্গমনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে জেনন-১৩১ পরমাণুতে পরিণত হয়।
𝟓𝟑𝟏𝟑𝟏𝐈 → 𝟓𝟒𝟏𝟑𝟏𝐗𝐞 + −𝟏𝟎𝐞
ইলেকট্রনকে বিটা-মাইনাস কণা বলা হয়। লক্ষ্য করুন যে ওপরের সমীকরণে ভর সংখ্যা একই থাকে এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১ বৃদ্ধি পায়, যা এই ধরনের ক্ষয়ের একটি বৈশিষ্ট্য।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, নিউক্লিয়াসের ভেতরে কিভাবে একটি ইলেকট্রন উৎপন্ন হতে পারে, যেখানে পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা যে সরল পারমাণবিক বর্ণনা দিয়েছিলাম তা থেকে বোঝা যায় যে নিউক্লিয়াস শুধুমাত্র প্রোটন এবং নিউট্রন দিয়ে গঠিত। এখন পর্যন্ত উপস্থাপিত সরল আলোচনার এটি একটি সীমাবদ্ধতা এবং এটি ব্যাখ্যা করা যায় এই বিবেচনা ক'রে যে, আমরা যে দুটি কণাকে প্রোটন এবং নিউট্রন বলি, সেগুলো নিজেরাই কোয়ার্ক নামক আরও ছোট কণা দ্বারা গঠিত। আমরা এখানে এগুলোকে কোনোভাবেই বিবেচনা করব না, শুধু এটুকু উল্লেখ করব যে বিভিন্ন ধরনের কোয়ার্কের কিছু সংমিশ্রণ প্রোটন উৎপন্ন করে এবং অন্য একটি সংমিশ্রণ নিউট্রন উৎপন্ন করে। এখানে মূল বার্তাটি হলো, এটা উপলব্ধি করা যে এই ধরনের একটি প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকে শুরু করার জন্য একটি সরল চিত্রই সর্বোত্তম উপায় এবং বাস্তব পরিস্থিতি যা বর্ণনা করা হয়েছে তার চেয়ে এটি অনেক বেশি জটিল। ওপরে প্রদত্ত বিটা-ক্ষয়ের আলোচনার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে দেখব।

(খ) পজিট্রন নির্গমন

যখন কোনো নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা এত বেশি হয়ে যায় যে নিউক্লিয়াসটি স্থিতিশীল থাকতে পারে না, তখন এটি একটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন নির্গমনের মাধ্যমে একটি প্রোটনকে নিউট্রনে রূপান্তরিত ক'রে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে।
এটি কোনো মুদ্রণ ত্রুটি নয়! একটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন, যা পজিট্রন নামেও পরিচিত, নির্গত হয়। পজিট্রন হলো বিটা-প্লাস কণা।
এখানকার ইতিহাসটা বেশ আকর্ষণীয়। একজন মেধাবী ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, এনরিকো ফের্মি , বিটা ক্ষয়ের একটি তত্ত্ব তৈরি করেন এবং তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস থেকে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক উভয় প্রকার চার্জযুক্ত ইলেকট্রন নির্গত হতে পারে। এই কণাগুলোকে প্রতিপদার্থের খণ্ড বলা যেতে পারে এবং পরবর্তীকালে পরীক্ষার মাধ্যমে এগুলো আবিষ্কৃত হয়। এগুলো বেশিক্ষণ স্থিতিশীল হয় না, কারণ এরা দ্রুত একটি সাধারণ ইলেকট্রনের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং এর পরবর্তী বিক্রিয়া, যাকে অ্যানিহিলেশন বলা হয়, তার ফলে দুটি গামা রশ্মি নির্গত হয়।
প্রতিপদার্থের আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে কল্পবিজ্ঞান লেখকরা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন এবং বহু বিজ্ঞানীর সঙ্গে একমত হয়ে জল্পনা করেছিলেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের কিছু অংশে হয়তো ঋণাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন দ্বারা গঠিত নিউক্লিয়াস রয়েছে, যাকে ঘিরে ধনাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু এটি আমাদের আলোচ্য বিষয় থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে!
আমাদের অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসে, যেখানে একটি অতিরিক্ত প্রোটন থাকে, তার প্রতিক্রিয়াটি নিম্নরূপে উপস্থাপন করা যেতে পারে:
p+ → n0 + e+
আবারও লক্ষ্য করুন যে, এই সমীকরণের উভয় দিকেই তড়িৎ আধান সংরক্ষিত থাকে।
এই ধরনের ক্ষয়ের একটি উদাহরণ ঘটে সোডিয়াম-২২-এর ক্ষেত্রে, যেটি একটি পজিট্রন নির্গমন করে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিয়ন-২২-এ পরিণত হয়:
𝟏𝟏𝟐𝟐𝐍𝐚 → 𝟏𝟎𝟐𝟐𝐍𝐞 + +𝟏𝟎𝐞
লক্ষ্য করুন যে ভর সংখ্যা একই থাকে এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১ কমে যায়।

(গ) ইলেকট্রন গ্রহণ

বিটা ক্ষয়ের এই তৃতীয় রূপে, একটি অভ্যন্তরীণ কক্ষপথের ইলেকট্রন একটি অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসের দিকে আকৃষ্ট হয়, যেখানে এটি একটি প্রোটনের সাথে মিলিত হয়ে একটি নিউট্রন গঠন করে। এই বিক্রিয়াটিকে নিম্নরূপে প্রকাশ করা যায়:
e- + p+ → n0
এই প্রক্রিয়াটি K-ক্যাপচার (ইলেকট্রন ক্যাপচার) নামেও পরিচিত, কারণ ইলেকট্রনটি প্রায়শই পরমাণুর K-শেল থেকে আকৃষ্ট হয়।
যেহেতু কোনো বিকিরণ নির্গত হয় না, তাহলে আমরা কিভাবে জানব যে এই ধরনের একটি প্রক্রিয়া ঘটে? অন্য কথায়, ঘটনাটি পরমাণুর মধ্যেই ঘটে এবং এ সম্পর্কে কোনো তথ্য পরমাণুর বাইরে যায় না। নাকি যায়? এই ধরনের ক্ষয়ের চিহ্ন পাওয়া যায় নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকা ইলেকট্রন মেঘের প্রভাব থেকে, যখন K-শেলের খালি স্থানটি বাইরের শেলের একটি ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ হয়। এই শূন্যস্থান পূরণের সাথে ইলেকট্রন মেঘ থেকে একটি এক্স রশ্মি নির্গমন জড়িত এবং এই এক্স রশ্মিই এই ধরনের বিটা ক্ষয়ের একটি চিহ্ন প্রদান করে।
নতুন নিউক্লিয়াস থেকে গামা-রশ্মি নির্গমনের মাধ্যমেও এই ধরনের ক্ষয় শনাক্ত করা যায়।
এই ধরনের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের একটি উদাহরণ হলো আয়রন-৫৫-র ক্ষেত্রে, যা একটি ইলেকট্রন ক্যাপচারের পর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ম্যাঙ্গানিজ-৫৫-এ পরিণত হয়। বিক্রিয়াটি নিম্নরূপে উপস্থাপন করা যেতে পারে:
𝟐𝟔𝟓𝟓𝐅𝐞 + −𝟏𝟎𝐞 → 𝟐𝟓𝟓𝟓𝐌𝐧
লক্ষ্য করুন যে, এই ধরনের ক্ষয়ে ভর সংখ্যা আবারও অপরিবর্তিত থাকে এবং পারমাণবিক সংখ্যা ১ কমে যায়।

গামা ক্ষয়

গামা ক্ষয়ে একটি অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস থেকে তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ আকারে শক্তি নির্গত হয়।

উচ্চ বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষা থেকে আপনাদের মনে রাখা উচিত যে, তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ হলো এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় ভৌত ঘটনা। এই বিকিরণকে এর কম্পাঙ্ক, তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং শক্তির নিরিখে চিহ্নিত করা যায়। বিকিরণের শক্তির নিরিখে চিন্তা করলে, আমরা পাই খুব কম শক্তির তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, যাকে বলা হয় বেতার তরঙ্গ; এর চেয়ে সামান্য বেশি শক্তির অবলোহিত বিকিরণ (ইনফ্রারেড বিকিরণ); আরও বেশি শক্তির দৃশ্যমান আলো; তারপর অতিবেগুনী বিকিরণ (আল্ট্রাভায়োলেট বিকিরণ) এবং এই বিকিরণের উচ্চ শক্তির রূপগুলোকে বলা হয় এক্স-রশ্মি ও গামা রশ্মি। আপনাদের এটাও মনে রাখা উচিত যে, এই বিকিরণগুলো মিলে যা তৈরি করে তাকে বলা হয় তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালী।

সামনে এগোনোর আগে এক্স রশ্মি এবং গামা রশ্মির মধ্যে পার্থক্যটি বিবেচনা করার জন্য এক মুহূর্ত বিরতি নেওয়া দরকার। এই দুই প্রকার বিকিরণই হলো উচ্চ শক্তির তড়িৎচুম্বকীয় রশ্মি এবং তাই কার্যত একই। এদের মধ্যে পার্থক্যটি এরা কি দিয়ে গঠিত তা নয়, বরং এরা কোথা থেকে আসে, তাই দিয়ে। সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি যে, যদি বিকিরণটি নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত হয়, তবে তাকে গামা রশ্মি বলা হয় এবং যদি এটি নিউক্লিয়াসের বাইরে থেকে, যেমন ইলেকট্রন মেঘ থেকে, নির্গত হয়, তবে তাকে এক্স রশ্মি বলা হয়।

গামা-ক্ষয়ের বিভিন্ন রূপ বিবেচনা করার আগে একটি শেষ বিষয় প্রাসঙ্গিক, আর তা হলো এই ধরনের উচ্চ শক্তির রশ্মি আসলে কী। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে গামা রশ্মি (এবং এক্স রশ্মিও!) কখনও তরঙ্গ হিসেবে এবং কখনও কণা হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করে। এই তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা পারমাণবিক স্তরে ভর এবং শক্তির সমতুল্যতা ব্যবহার ক'রে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যখন আমরা একটি গামা রশ্মিকে তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করি, তখন অন্য যে কোনো তরঙ্গের মতোই কম্পাঙ্ক এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মতো পরিভাষা ব্যবহার করা সুবিধাজনক বলে মনে করা হয়। এছাড়াও, যখন আমরা একটি গামা রশ্মিকে কণা হিসেবে বর্ণনা করি, তখন আমরা ভর এবং বৈদ্যুতিক আধানের মতো পরিভাষা ব্যবহার করি। অধিকন্তু, এই কণাগুলোর জন্য তড়িৎচুম্বকীয় ফোটন পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। তবে এই ফোটনগুলোর আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এদের ভর বা আধান কোনোটিই নেই!

গামা ক্ষয়ের দুটি সাধারণ রূপ রয়েছে:

(ক) সমাণু (আইসোমারিক) রূপান্তর

একটি উত্তেজিত নিউক্লিয়াস গামা-রশ্মি নির্গমনের মাধ্যমে তার ভূমি অবস্থা বা অনুত্তেজিত অবস্থায় পৌঁছোতে পারে।
এই ধরনের ক্ষয়ের একটি উদাহরণ হলো টেকনেশিয়াম-৯৯m-এর ক্ষয় – যা বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সবচেয়ে সাধারণ রেডিও-আইসোটোপ। এই বিক্রিয়াটি নিম্নরূপে প্রকাশ করা যায়:
𝟒𝟑𝟗𝟗𝐦𝐓𝐜 → 𝟒𝟑𝟗𝟗𝐓𝐜 + γ
এখানে টেকনেশিয়াম-৯৯ এর একটি নিউক্লিয়াস উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ, এর মধ্যে অতিরিক্ত শক্তি থাকে। এক্ষেত্রে উত্তেজিত অবস্থাকে মেটাস্টেবল অবস্থা বলা হয় এবং তাই নিউক্লিয়াসটিকে টেকনেশিয়াম-৯৯m (m মানে মেটাস্টেবল) বলা হয়। উত্তেজিত নিউক্লিয়াসটি একটি গামা-রশ্মি নির্গত ক'রে তার অতিরিক্ত শক্তি ত্যাগ করে টেকনেশিয়াম-৯৯ এ পরিণত হয়।

(খ) অভ্যন্তরীণ রূপান্তর

এখানে একটি উত্তেজিত নিউক্লিয়াসের অতিরিক্ত শক্তি একটি পারমাণবিক ইলেকট্রনকে, যেমন একটি K-শেল ইলেকট্রনকে, প্রদান করা হয়।

ক্ষয় প্রণালী

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের একটি চাক্ষুষ উপস্থাপনা দেওয়ার জন্য ক্ষয় প্রণালীগুলো বহুল ব্যবহৃত হয়। তুলনামূলকভাবে একটি সরল ক্ষয়ের প্রণালী নিচে দেখানো হলো:

এই প্রক্রিয়াটি দেখানো হয়েছে হাইড্রোজেন-৩ এর জন্য, যেটি ১২.৩ বছরের অর্ধায়ুতে ০.০০৫৭ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট (MeV) শক্তি সম্পন্ন একটি বিটা-মাইনাস কণা নির্গমনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে হিলিয়াম-৩ এ পরিণত হয়।

আরও জটিল একটি ক্ষয়ের প্রক্রিয়া হলো সিজিয়াম-১৩৭ এর।

এই আইসোটোপটি দুটি বিটা-মাইনাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। একটি প্রক্রিয়ায়, ৫% বিয়োজন ঘটে এবং ১.১৭ MeV শক্তি সম্পন্ন একটি বিটা-মাইনাস কণা নির্গত হয়ে বেরিয়াম-১৩৭ উৎপন্ন হয়। দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায়, যা আরও ঘন ঘন ঘটে (বাকি ৯৫% বিয়োজনে), ০.৫১ MeV শক্তি সম্পন্ন একটি বিটা-মাইনাস কণা নির্গত হয়ে বেরিয়াম-১৩৭m উৎপন্ন করে – অন্য কথায়, এটি একটি মেটাস্টেবল অবস্থায় থাকা বেরিয়াম-১৩৭ নিউক্লিয়াস। এরপর বেরিয়াম-১৩৭m আইসোমারিক ট্রানজিশনের মাধ্যমে ০.৬৬২ MeV শক্তির একটি গামা-রশ্মি নির্গমন ক'রে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

ক্ষয় প্রণালীর জন্য ব্যবহৃত সাধারণ পদ্ধতিটি ডানদিকের চিত্রে দেখানো হয়েছে।

উল্লম্ব অক্ষে শক্তি এবং অনুভূমিক অক্ষে পারমাণবিক সংখ্যা স্থাপন করা হয় – যদিও প্রকৃত প্রণালীগুলিতে এই অক্ষগুলি খুব কমই দেখানো হয়। যে আইসোটোপ থেকে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে তা সবার ওপরে দেখানো হয়েছে, – ওপরের ক্ষেত্রে এটি হলো X। এই আইসোটোপটিকে প্যারেন্ট বা মূল আইসোটোপ বলা হয়। প্যারেন্ট ক্ষয়প্রাপ্ত হলে শক্তি হারায় এবং তাই ক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন পদার্থ, যা ডটার বা অপত্য আইসোটোপ নামে পরিচিত, সেগুলিকে নিম্ন শক্তি স্তরে স্থাপন করা হয়।

চিত্রটি তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সাধারণ রূপগুলির পরিস্থিতি তুলে ধরে। বামদিকে আলফা-ক্ষয় দেখানো হয়েছে, যেখানে ভর সংখ্যা ৪ এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ কমে গিয়ে ডটার A উৎপন্ন হয়। এর ডানদিকে বিটা-প্লাস ক্ষয়ের প্রণালী দেখানো হয়েছে, যা ডটার B উৎপন্ন করে। চিত্রের ডানদিকে বিটা-মাইনাস ক্ষয় এবং তার পরে গামা-ক্ষয়ের পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে, যেখানে যথাক্রমে C এবং D নামক ডটার উৎপন্ন হয়।

বহু নির্বাচনী প্রশ্ন

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ওপর বহু নির্বাচনী প্রশ্ন পেতে এখানে ক্লিক করুন।

বহিঃসংযোগ

  • বিকিরণ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য – রেডিয়েশন এফেক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন থেকে বিভিন্ন ধরণের আয়নাইজিং বিকিরণের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ – একটি জাপান-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ গবেষণা সংস্থা যা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে গবেষণা পরিচালনা করে।
  • বিকিরণ এবং জীবন – ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইট থেকে।
  • বিকিরণ এবং তেজস্ক্রিয়তা – ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের হেলথ ফিজিক্স সোসাইটির স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার দ্বারা তৈরি একটি স্ব-গতিসম্পন্ন পাঠ, যেখানে বিকিরণ, তেজস্ক্রিয়তা, পরমাণু, আলফা বিকিরণ, বিটা বিকিরণ এবং গামা বিকিরণের উপর অধ্যায় রয়েছে।

টেমপ্লেট:BookCat