পরমাণু চিকিৎসায় মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান/পরমাণু ও নিউক্লিয়ার গঠন

আমরা এখানে যা আলোচনা করব তার বেশিরভাগের সাথেই উচ্চ বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান পড়ার সময় আপনারা পরিচিত হয়েছেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোর প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য আমরা নিচে এই বিষয়বস্তুগুলো আবার পর্যালোচনা করব। এই অধ্যায়টি আপনাদের এই বিষয়ে নিজেদের বুঝে নেওয়া যাচাই করার একটি সুযোগও দেবে।
এই অধ্যায়ে পারমাণবিক গঠন, নিউক্লীয় গঠন, নিউক্লিয়াসের শ্রেণিবিভাগ, বন্ধন শক্তি এবং নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা আলোচনা করা হয়েছে।
পারমাণবিক গঠন
পরমাণুকে সকল পদার্থের মৌলিক গঠনের একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরমাণুকে পদার্থের এমন একটি ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য কণা হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। সরল পারমাণবিক তত্ত্ব অনুসারে, এটি দুটি উপাদান নিয়ে গঠিত: একটি হলো নিউক্লিয়াস (প্রোটন এবং নিউট্রন দ্বারা গঠিত) এবং দ্বিতীয়টি হলো একটি ইলেকট্রন মেঘ যেটি নিউক্লিয়াসকে পরিবেষ্টন করে থাকে। এই পরিস্থিতিকে কিছু দিক থেকে সূর্যের চারপাশে গ্রহের প্রদক্ষিণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করা যেতে পারে।
আকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি পরমাণুর ব্যাসার্ধ প্রায় ১০-১০ মিটার, যেখানে একটি নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ প্রায় ১০-১৪ মিটার, অর্থাৎ নিউক্লিয়াস প্রায় দশ হাজার ভাগ ছোট। পরিস্থিতিটিকে একটি খেলার মাঠের মাঝখানে থাকা ক্রিকেট বলের মতো করে দেখা যেতে পারে, যেখানে বলটি নিউক্লিয়াসের প্রতিনিধিত্ব করে এবং ইলেকট্রনগুলো দর্শকদের বসার জায়গার আশেপাশে কোথাও প্রদক্ষিণ করছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের মনে হয় যে, পরমাণু প্রধানত শূন্যস্থান দিয়ে গঠিত হওয়া উচিত। তবে, পরিস্থিতিটি এই সরল চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, কারণ আমাদের সেই ভৌত শক্তিগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে যা পরমাণুকে একত্রে বেঁধে রাখে।
রাসায়নিক ঘটনাকে প্রতিটি পরমাণুর ইলেকট্রনগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভাবা যেতে পারে। অপরদিকে, তেজস্ক্রিয়তাকে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে সংঘটিত পরিবর্তন হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
নিউক্লিয়াস
নিউক্লিয়াসের একটি সরল বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে এটি প্রোটন এবং নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এই দুই প্রকার কণাকে সম্মিলিতভাবে নিউক্লিয়ন বলা হয়, অর্থাৎ যে কণাগুলো নিউক্লিয়াসে বাস করে।
ভরের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি প্রোটনের ভর প্রায় একটি নিউট্রনের ভরের সমান এবং এদের প্রত্যেকটির ভর একটি ইলেকট্রনের ভরের প্রায় ২,০০০ গুণ বেশি। সুতরাং, একটি পরমাণুর বেশিরভাগ ভর তার কেন্দ্রের ক্ষুদ্র অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকে।
বৈদ্যুতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রোটন ধনাত্মক আধানযুক্ত এবং নিউট্রনের কোনো আধান নেই। একটি পরমাণু সম্পূর্ণ একা থাকলে (যদি তা অর্জন করা সম্ভব হতো!) বৈদ্যুতিকভাবে আধানহীন হবে। সুতরাং, এই ধরনের একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা অবশ্যই সেই পরমাণুকে প্রদক্ষিণকারী ইলেকট্রনের সংখ্যার সমান হতে হবে।
নিউক্লিয়াসের শ্রেণিবিভাগ
নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে পারমাণবিক সংখ্যা হলো একটি নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটনের সংখ্যা এবং একে Z প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয়। রসায়নের পাঠ থেকে আপনার মনে থাকবে যে, এই সংখ্যাটি মৌলের পর্যায় সারণীতে কোনো মৌলের অবস্থানও নির্দেশ করে।
ভর সংখ্যা হলো একটি নিউক্লিয়াসে থাকা নিউক্লিয়নের সংখ্যা, অর্থাৎ প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যার যোগফল এবং একে A প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
লক্ষ্য করুন, এখানকার প্রতীকগুলো কিছুটা অদ্ভুত, কারণ পারমাণবিক সংখ্যাকে A প্রতীক এবং ভর সংখ্যাকে M-এর মতো অন্য কোনো প্রতীক দিলে কিছু বিভ্রান্তি এড়ানো যেত, কিন্তু পৃথিবীটা এত সহজ নয়!
কোনো নির্দিষ্ট মৌলের নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা একই কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন হওয়া সম্ভব, অর্থাৎ পারমাণবিক সংখ্যা একই কিন্তু ভর সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। এই ধরনের নিউক্লিয়াসকে আইসোটোপ বলা হয়। সকল মৌলেরই আইসোটোপ রয়েছে এবং এর সংখ্যা হাইড্রোজেনের জন্য তিনটি থেকে শুরু করে সিজিয়াম ও বেরিয়ামের মতো মৌলের জন্য ৩০টিরও বেশি পর্যন্ত হতে পারে।
রসায়নে বিভিন্ন মৌলকে শ্রেণিবদ্ধ করার একটি তুলনামূলকভাবে সহজ উপায় রয়েছে, যেখানে হাইড্রোজেনের জন্য H, হিলিয়ামের জন্য He ইত্যাদির মতো প্রতীক ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন আইসোটোপ শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিটি এই পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে রাসায়নিক প্রতীকের আগে ভর সংখ্যা বোঝানোর জন্য একটি সুপারস্ক্রিপ্ট এবং পারমাণবিক সংখ্যা বোঝানোর জন্য একটি সাবস্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হয়। অন্য কথায়, একটি আইসোটোপকে এভাবে শনাক্ত করা হয়:
যেখানে X হলো মৌলটির রাসায়নিক প্রতীক;
A হলো "ভর সংখ্যা," (প্রোটন + নিউট্রন);
Z হলো "পারমাণবিক সংখ্যা," (পর্যায় সারণীতে মৌলটিকে শনাক্তকারী সংখ্যা)।
উদাহরণস্বরূপ, হাইড্রোজেনের বিষয়টি নেওয়া যাক। এর তিনটি আইসোটোপ রয়েছে:
- সবচেয়ে সাধারণ আইসোটোপটির নিউক্লিয়াস একটিমাত্র প্রোটন দ্বারা গঠিত, যাকে একটি ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করে,
- দ্বিতীয় আইসোটোপটির নিউক্লিয়াসে একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রন থাকে এবং একে একটি ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করে,
- তৃতীয় আইসোটোপটির নিউক্লিয়াস একটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন দ্বারা গঠিত এবং একেও একটিমাত্র ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করে।
এই আইসোটোপগুলোর একটি সরল চিত্র নিচে দেখানো হলো। তবে মনে রাখবেন যে, পরমাণুর আকারের তুলনায় নিউক্লিয়াসের আকার সম্পর্কে আমরা পূর্বে যা উল্লেখ করেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি সরলীকৃত চিত্র। কিন্তু আইসোটোপগুলোকে কিভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, তা দেখানোর জন্য এই চিত্রটি তবুও উপযোগী।
প্রথম আইসোটোপ, যা সাধারণত হাইড্রোজেন নামে পরিচিত, তার ভর সংখ্যা ১, পারমাণবিক সংখ্যা ১ এবং তাই এটিকে এভাবে চিহ্নিত করা হয়:
দ্বিতীয় আইসোটোপ, যা সাধারণত ডিউটেরিয়াম নামে পরিচিত, তার ভর সংখ্যা ২, পারমাণবিক সংখ্যা ১ এবং এটিকে নিম্নরূপে চিহ্নিত করা হয়:
তৃতীয় আইসোটোপ, যা সাধারণত ট্রিটিয়াম নামে পরিচিত, তা নিম্নরূপে চিহ্নিত করা হয়:
সকল আইসোটোপের জন্য একই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি এখন বুঝতে পারবেন যে ইউরেনিয়াম আইসোটোপ, তে, ৯২টি প্রোটন এবং ১৪৪টি নিউট্রন রয়েছে।
শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে শেষ কথা হলো, আমরা মৌলের নামের পরে ভর সংখ্যা উল্লেখ করেও স্বতন্ত্র আইসোটোপকে নির্দেশ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ডিউটেরিয়ামকে হাইড্রোজেন-২ এবং -কে ইউরেনিয়াম-২৩৬ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি।
এই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি থেকে সরে আসার আগে, আসুন আমরা রসায়ন এবং পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্যটি আরও ভালোভাবে বিবেচনা করি। আপনাদের মনে থাকবে যে, জলের অণু দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণুর বন্ধন দ্বারা গঠিত। তাত্ত্বিকভাবে, যদি আমরা হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণুগুলোকে এইভাবে বহু বহু বিলিয়ন বার একত্রিত করি, তাহলে আমরা এক গ্লাস জল তৈরি করতে পারব। আমরা হাইড্রোজেনের পরিবর্তে ডিউটেরিয়াম ব্যবহার করেও আমাদের এক গ্লাস জল তৈরি করতে পারি। রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দ্বিতীয় গ্লাসের জল তাত্ত্বিকভাবে প্রায় একই রকম হবে। তবে, পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের দ্বিতীয় গ্লাসটি প্রথমটির চেয়ে ভারী হবে, কারণ প্রতিটি ডিউটেরিয়াম নিউক্লিয়াসের ভর প্রতিটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের ভরের প্রায় দ্বিগুণ। প্রকৃতপক্ষে, এইভাবে তৈরি জলকে ভারী জল বলা হয়।
পারমাণবিক ভর একক
ভরের প্রচলিত একক, কিলোগ্রাম, নিউক্লিয়াসের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার জন্য বেশ বড়। এই কারণে, পারমাণবিক ভর একক (amu) নামক একটি বিশেষ একক প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। এই এককটিকে কখনও কখনও কার্বনের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও সহজলভ্য আইসোটোপ, অর্থাৎ ১২C-এর ভরের ১/১২ অংশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। গ্রামের হিসাবে, ১ amu = ১.৬৬ x 10-২৪ গ্রাম, অর্থাৎ, এক গ্রামের দশ লক্ষ কোটি কোটি ভাগের এক ভাগের চেয়ে সামান্য বেশি।
এই ভিত্তিতে প্রোটন, mp এবং নিউট্রন, mn-এর ভর হলো:
এবং
অপরদিকে ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে তা মাত্র ০.০০০৫৫ amu।
বন্ধন শক্তি
আমরা এখন পারমাণবিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করার অবস্থানে আছি। আমরা এখনো পর্যন্ত যা আলোচনা করেছি, তা থেকে দেখেছি যে নিউক্লিয়াস হলো পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল এবং এটি নিরপেক্ষ ও ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা দ্বারা গঠিত। সুতরাং, ইউরেনিয়ামের (Z=৯২) মতো একটি বড় নিউক্লিয়াসে, পরমাণুর কেন্দ্রের একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন কেন্দ্রীভূত থাকে। একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে যে, এতগুলো ধনাত্মক আধান কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নিউক্লিয়াসটি কেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় না? উপাদানগুলোর মধ্যে এত বেশি স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও একটি নিউক্লিয়াস কিভাবে একটি সত্ত্বা হিসেবে টিঁকে থাকতে পারে? কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলো কি প্রোটনগুলোকে পরমাণুর কেন্দ্র থেকে আকর্ষণ ক'রে দূরে সরিয়ে দেবে না?
উদাহরণস্বরূপ, আমরা হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসের বিষয়টি বিবেচনা করি। এই নিউক্লিয়াসে দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রন রয়েছে, তাই amu-এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পূর্বে যা আলোচনা করেছি তা থেকে বের করতে পারি যে...
এবং
সুতরাং আমরা আশা করতে পারি যে নিউক্লিয়াসটির মোট ভর হবে ৪.০৩২৯৮ amu।
একটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসের পরীক্ষামূলকভাবে নির্ধারিত ভর এর থেকে কিছুটা কম — মাত্র ৪.০০২৬০ amu। অন্য কথায়, এই নিউক্লিয়াসটির ভর সম্পর্কে আমরা যা আশা করতে পারি এবং আমরা বাস্তবে যা পরিমাপ করি, তার মধ্যে ০.০৩০৩৮ amu-এর একটি পার্থক্য রয়েছে। আপনি এই পার্থক্যটিকে মাত্র ০.৭৫% হওয়ায় খুব সামান্য বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন যে, যেহেতু একটি ইলেকট্রনের ভর ০.০০০০৫৫ amu, তাই এই পার্থক্যটি আসলে প্রায় ৫৫টি ইলেকট্রনের ভরের সমান। সুতরাং, এটি এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে।
এটা ভাবা যেতে পারে যে এই অনুপস্থিত ভর রূপান্তরিত হয় শক্তিতে, যা নিউক্লিয়াসকে একত্রে ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়; এটি বন্ধন শক্তি নামক এক প্রকার শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আপনি বলতে পারেন, সব সম্পর্কের মতোই, সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখার জন্য শক্তি ব্যয় করতেই হয়!
নিউক্লিয়াসের ভরের ক্ষেত্রে গ্রাম এককের মতোই, নিউক্লিয়াসকে একত্রে বেঁধে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির কথা বিবেচনা করলে শক্তির সাধারণ একক, জুল এককও বেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়। পারমাণবিক স্কেলে শক্তি প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত এককটি হলো ইলেকট্রন ভোল্ট, এর প্রতীক: eV।
এক ইলেকট্রন ভোল্টকে সেই পরিমাণ শক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা একটি ইলেকট্রন এক ভোল্টের বিভব পার্থক্যের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অর্জন করে। এই সংজ্ঞাটি নিজে থেকে এখানে আমাদের খুব বেশি সাহায্য করবে না এবং এটি শুধুমাত্র সম্পূর্ণতার স্বার্থে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই আপাতত এটি নিয়ে চিন্তা করবেন না। শুধু মনে রাখবেন যে এটি এমন একটি একক যা পারমাণবিক স্কেলে কার্যকর অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ শক্তিকে প্রকাশ করে। তবে বন্ধন শক্তির ক্ষেত্রে এটি কিছুটা ছোট হওয়ায় প্রায়শই মেগা-ইলেকট্রন ভোল্ট (MeV) ব্যবহার করা হয়।
আলবার্ট আইনস্টাইন নিম্নলিখিত সমীকরণটি ব্যবহার করে পারমাণবিক স্তরে ভর (m) এবং শক্তির (E) সমতুল্যতার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন:
যেখানে c হলো আলোর বেগ।
এটা দেখানো সম্ভব যে ১ amu হচ্ছে ৯৩১.৪৮ MeV শক্তির সমতুল্য। অতএব, হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসের প্রত্যাশিত ও পরিমাপকৃত ভরের মধ্যে আমরা পূর্বে আলোচিত ০.০৩০৩৮ amu ভরের পার্থক্যটি প্রায় ২৮ MeV-এর সমতুল্য। এটি নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা চারটি নিউক্লিয়নের প্রতিটির জন্য প্রায় ৭ MeV শক্তি নির্দেশ করে।
নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা
অধিকাংশ স্থিতিশীল আইসোটোপে প্রতি নিউক্লিয়নের বন্ধন শক্তি ৭ থেকে ৯ MeV-এর মধ্যে থাকে। নিউক্লিয়াসের মধ্যে দুটি প্রতিযোগী বল কাজ করে: প্রোটনগুলোর মধ্যে স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণ এবং নিউক্লিয়নগুলোর (প্রোটন ও নিউট্রন) মধ্যে আকর্ষণকারী নিউক্লীয় বল। স্থির-তড়িৎ বল একটি দীর্ঘ-পাল্লার বল, নিউক্লিয়াসে যত বেশি প্রোটন যুক্ত হতে থাকে, তার ভারসাম্য বজায় রাখা ততটাই কঠিন হয়ে পড়ে। নিউক্লীয় বল, যা অবশিষ্ট সবল বল হিসেবে উদ্ভূত হয় (সবল বল একটি নিউক্লিয়নের মধ্যে কোয়ার্কগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখে), সেটি একটি স্বল্প-পাল্লার বল যা শুধুমাত্র খুব অল্প দূরত্বের পরিসরে (~ ১.৫ fm) কাজ করে, কারণ এটি একটি ইউকাওয়া বিভব থেকে উদ্ভূত হয়। (তড়িৎচুম্বকত্ব একটি দীর্ঘ-পাল্লার বল, কারণ এর বল বাহক ফোটন ভরহীন; নিউক্লীয় বল একটি স্বল্প-পাল্লার বল, কারণ এর বল বাহক পায়ন বিশাল ভরযুক্ত)। সুতরাং, বৃহত্তর নিউক্লিয়াসগুলি কম স্থিতিশীল হয় এবং এদের জন্য প্রোটনের তুলনায় নিউট্রনের একটি বৃহত্তর অনুপাতের প্রয়োজন হয় (যা শক্তিশালী আকর্ষণ বলে অবদান রাখে, কিন্তু দূরপাল্লার স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণে নয়)। কম Z নিউক্লাইডগুলির জন্য প্রোটনের তুলনায় নিউট্রনের অনুপাত প্রায় ১, যদিও উচ্চ Z নিউক্লাইডগুলির জন্য এটি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১.৫ হয়, যেমনটি নিচে পারমাণবিক স্থিতিশীলতা বক্ররেখা-তে দেখানো হয়েছে।

অন্য কথায়, প্রোটনের সংখ্যা বাড়লে যে স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণ বৃদ্ধি পায়, তার প্রভাব সামলানোর জন্য নিউক্লিয়াসকে একত্রে বেঁধে রাখার মতো পর্যাপ্ত শক্তি যোগাতে নিউট্রনের সংখ্যা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে হয়।
যেমনটি আমরা আগে উল্লেখ করেছি, পর্যায় সারণির প্রতিটি মৌলের বেশ কয়েকটি আইসোটোপ রয়েছে। দেখা গেছে যে, প্রতিটি মৌলের সবচেয়ে স্থিতিশীল আইসোটোপের নিউক্লিয়াসে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক নিউট্রন থাকে। এই স্থিতিশীল আইসোটোপগুলোর ক্ষেত্রে প্রোটন সংখ্যার বিপরীতে নিউট্রন সংখ্যার একটি লেখচিত্র অঙ্কন করলে যা পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা রেখাচিত্র:
লক্ষ্য করুন যে, ছোট নিউক্লিয়াসের ক্ষেত্রে প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যা সমান হয়। কিন্তু এটাও লক্ষ্য করুন যে, নিউক্লিয়াসের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তার আকার বড় হওয়ার সাথে সাথে প্রোটন সংখ্যার চেয়ে নিউট্রনের সংখ্যা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অন্য কথায়, প্রোটনগুলোর মধ্যেকার স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণকে প্রতিহত করতে ব্যবহৃত বন্ধন শক্তিতে অবদান রাখার জন্য আরও বেশি নিউট্রনের প্রয়োজন হয়।
তেজস্ক্রিয়তা
পর্যায় সারণীতে থাকা প্রায় একশটি মৌলের প্রায় ২,৪৫০টি জ্ঞাত আইসোটোপ রয়েছে। আপনি পর্যায় সারণীর তুলনায় একটি আইসোটোপ সারণীর আকার কল্পনা করতে পারেন! অস্থিতিশীল আইসোটোপগুলো নিউক্লীয় স্থিতিশীলতা রেখার ওপরে বা নিচে অবস্থান করে। এই অস্থিতিশীল আইসোটোপগুলো ফিশন নামক প্রক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে, অথবা বিকিরণের আকারে কণা এবং / অথবা শক্তি নির্গত ক'রে স্থিতিশীলতা রেখায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। এই পরবর্তী প্রক্রিয়াটিকে তেজস্ক্রিয়তা বলা হয়।
সুতরাং, তেজস্ক্রিয়তা হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসগুলো বিভক্ত হয়ে তেজস্ক্রিয় কণা (আলফা কণা, বিটা কণা এবং গামা রশ্মি) উৎপন্ন করে।
তেজস্ক্রিয়তা শব্দটি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা দরকার। উদাহরণস্বরূপ, পারমাণবিক স্থিতিশীলতার সাথে রেডিওর কি সম্পর্ক? ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে রাখতে হবে যে, প্রায় ১০০ বছর আগে যখন এই বিকিরণগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখন আমরা ঠিক জানতাম না যে আমরা কি নিয়ে কাজ করছি। যখন অঁরি বেকেরেল এবং মারি কুরির মতো ব্যক্তিরা প্রাথমিকভাবে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নির্গত এই অদ্ভুত বিকিরণ নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন মনে করা হতো যে এই বিকিরণগুলো কোনোভাবে অন্য একটি ঘটনার সাথে সম্পর্কিত, যা সেই সময়ে ভালোভাবে বোঝা যায়নি — আর তা হলো রেডিও যোগাযোগ। এই ভিত্তিতে এটা বোঝা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় যে, কিছু লোক মনে করতেন এই দুটি ঘটনা কোনোভাবে সম্পর্কিত এবং তাই যে পদার্থগুলো বিকিরণ নির্গত করত সেগুলোকে তেজস্ক্রিয় (রেডিও অ্যাকটিভ) বলা হতো।
আমরা আজ জানি যে এই দুটি ঘটনা সরাসরি সম্পর্কিত নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা ঐতিহাসিক কারণে তেজস্ক্রিয়তা শব্দটি ধরে রেখেছি। কিন্তু এই অধ্যায়ের এই পর্যায়ে এসে আপনার কাছে এটা বেশ স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, তেজস্ক্রিয় শব্দটি অস্থিতিশীল আইসোটোপ থেকে কণা এবং / অথবা শক্তির নির্গমনকে বোঝায়। অস্থিতিশীল আইসোটোপ, যেমন যেগুলোর স্থিতিশীল সত্ত্বা থাকার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রোটন থাকে, সেগুলোকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বলা হয় এবং সংক্ষেপে রেডিওআইসোটোপ বলা হয়। কখনও কখনও রেডিওনিউক্লাইড পরিভাষাটিও ব্যবহৃত হয়।
অবশেষে, ওপরে উল্লিখিত প্রায় ২,৪৫০টি আইসোটোপের মধ্যে প্রায় ৩০০টি প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। বাকিগুলো মনুষ্যসৃষ্ট, অর্থাৎ সেগুলো কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করা হয়। এই প্রায় ২,১৫০টি কৃত্রিম আইসোটোপ গত ১০০ বছরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হয়েছে।
আমরা এই উইকিবইয়ের পরবর্তী কোনো অধ্যায়ে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের উৎপাদন বিষয় নিয়ে ফিরে আসব এবং আপাতত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ দ্বারা নির্গত বিকিরণের প্রকারভেদ বর্ণনা ক'রে অগ্রসর হব।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
পারমাণবিক এবং নিউক্লীয় কাঠামোর ওপর বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পেতে এখানে ক্লিক করুন।
বহিঃসংযোগ
- নভেল পর্যায় সারণী - একটি ইন্টারেক্টিভ সারণী যা প্রতিটি মৌল সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে।
- মারি ও পিয়ের কুরি এবং পোলোনিয়াম ও রেডিয়ামের আবিষ্কার - নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ।
- প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা - প্রকৃতিতে তেজস্ক্রিয়তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ - এতে আদিম তেজস্ক্রিয় নিউক্লাইড, মহাজাগতিক বিকিরণ, মানবসৃষ্ট তেজস্ক্রিয় নিউক্লাইড, সেইসাথে মাটি, মহাসাগর, মানবদেহ এবং নির্মাণ সামগ্রীতে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার উপর অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে - হেলথ ফিজিক্স সোসাইটির মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শাখা থেকে।
- দ্য পার্টিকেল অ্যাডভেঞ্চার - পরমাণুর অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীর একটি ইন্টারেক্টিভ ভ্রমণ, যা ব্যাখ্যা করে পদার্থবিজ্ঞানীরা নিউক্লীয় ও উপ-নিউক্লীয় পদার্থ অনুসন্ধানের জন্য কী কী আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেন এবং ডিটেক্টরের সাহায্যে কীভাবে তাঁদের পরীক্ষার ফলাফল পরিমাপ করেন - এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবের পার্টিকেল ডেটা গ্রুপ থেকে উপস্থাপিত এবং জেনেভার সার্নে এর প্রতিরূপ রয়েছে।
- ওয়েবএলিমেন্টস - মৌলসমূহের একটি চমৎকার ওয়েব-ভিত্তিক পর্যায় সারণী, যাতে প্রতিটি মৌল সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য রয়েছে - এটি মূলত ইংল্যান্ডের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক উইন্টারের সৃষ্টি।
টেমপ্লেট:BookCat ca:Física bàsica de la medicina nuclear/Estructura atòmica i nuclear
